শনিবার , 20 অক্টোবর 2018
ব্রেকিং

জামাইবাড়ীতে ইফতারী আম-কাঠলী খই-চিড়া সন্দেশ

নাজমুল ইসলাম মকবুল, লেখকঃ সভাNAJMUL ISLAM MAKBUL Pপতি, সিলেট লেখক ফোরাম।

 

আমাদের দেশ সহ বহির্বিশ্বেও সিলেটীদের চাল-চলন আতিথেয়তা কৃষ্টি সংস্কৃতি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও আলাদা নাম ডাকের কথা কারও অজানা নয়। অতিথি আপ্যায়নে সিলেটীদের যেমন জুড়ি মেলা ভার তেমনি অতিথি হিসেবে কারও বাড়িতে যাবার সময় হর কিসিমের মৌসুমী ফল ফলাদি মিষ্টি মিঠাই বিস্কিট চানাচুর বা পছন্দসই যে কোন জিনিস হাতে করে নেয়াটা একটি অতি প্রাচীন রেওয়াজ হিসেবে পরিচিত। তবে জামাইবাড়ীতে বৎসরের বিভিন্ন মৌসুমে বাধ্যতামুলকভাবে যা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করার রীতি আবহমান কাল ধরে চলে আসছে তার আলাদা কিছু নাম ডাক আছে। যার কয়েকটি হলো রমজানে ইফতারী জৈষ্ঠ্যে আম-কাঠলী ভাদ্র মাসে খই চিড়া এবং অগ্রহায়নে নিজ হাতে তৈরী সন্দেশ (হান্দেশ) ও পিঠা পায়েস।
রমজান মাসের ইফতারীঃ
রমজান মাসে জামাই বাড়ীতে ইফতারী প্রদান সিলেটে বহুল প্রচলিত হলেও যদ্দুর জানা যায় অন্যান্য জেলায় এর প্রচলন তেমন একটা নেই বললেই চলে। আদিকালে রমজানের মধ্যভাগের যে কোন একদিন ইফতারের পুর্বে কনের অভিভাবক যেমনঃ পিতা/ভাই/চাচা বা অন্য কোন নিকটাত্মীয় সামর্থমতো কয়েক কেজি জিলাপী নিমকী খাজা আমির্তি ইত্যাদি কিনে মাঝারী বা কিছুটা বড় সাইজের গামলায় (বউল) ভর্তি করে বড় রঙীন স্কয়ার সাইজের নকশী রূমাল দিয়ে গাট্টি বেধে হাতে বা কাধে বহন করে অথবা বহনকারী লোকের সাহায্যে ভার বেধে (ছিকা বাউ দিয়ে) জামাই বাড়ীতে ইফতারের পূর্বে গিয়ে হাজির হতেন গর্ব সহকারে। সাথে গৃহিনীর দেয়া কুচি কুচি করে কাটা আদা ও পান সুপারীর একটি পুঠলী (মছা) ইফতারীর সহায়ক হিসেবে সাথে নিতে ভুল করতেননা। ইফতারী আসলেই বাড়ীর কচি কাচারা ফুর্তিতে হৈ চৈ করে নেচে উঠত। ইফতারের পূর্বেই বাড়ীর এবং পাড়া পড়শীর প্রত্যেকের ঘরে ঘরে ইফতারী সামগ্রী বিলি করা হতো। ইফতারের পরে মেজবানের ভুড়িভোজনের জন্য তাৎক্ষনিকভাবে জবাই করা হতো ঘরে পোষা মুরগী। উল্লেখ্য তখনকার সময়ে ফার্মের মুরগী পাওয়া যেত না। নিজের ঘরে পোষা মুরগী না থাকলে বা ধরতে ব্যর্থ হলে পার্শ্ববর্তী কোন ঘর থেকে মুরগী কিনে বা ধার করে আনা হতো মান ইজ্জত রক্ষার জন্য। মুরগী ধরার জন্য বাড়ীর চটপটে কিশোর কিশোরিদের কাজে লাগানো হতো। ব্যর্থ হলে খাচার (জাখা) নিচে খাদ্য সামগ্রী দিয়ে লম্বা বাশ দিয়ে সটকা বা ফাদের মতো তৈরি করে দুর থেকে ঝাপ দিয়ে মুরগি গ্রেফতার করা হতো। মেহমান যাতে মুরগীর কক্ কক্ শব্দ শুনতে না পান সেজন্য মুরগীর গলা চেপে ধরা হতো সতর্কতার সাথে এবং তড়িগড়ি করে জবাই করা হতো। মেহমান দেখতে পেলে জবাই না করার জন্য পীড়াপীড়ি করে দিতেন। আবার কোন কোন মেহমান মুরগী খাবার লোভে দেখেও না দেখার ভান করতেন। একান্ত কোথাও মুরগী না পেলে বা ব্যর্থ হলে আন্ডা এনে ভুনা বা ভাজি করা হতো। মাছ দিয়ে মেহমানদেরকে খাওয়ালে বদনাম হতো।
বর্তমানে মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নত হওয়ায় ইফতারীর ধরন ও মেনুতে অনেকটা আভিজাত্যের ছাপ ও বাহারী রং চং এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। রমজানের প্রথম দিনে দেশি বিদেশী ফল ফলাদি সহ হাতের অথবা বাজারে তৈরি রকমারী ইফতার সামগ্রী জামাই বাবাজীর বাড়ীতে পাঠাতে হয় পয়লা রমজানে ইফতার করার জন্য। এরপর রমজানের প্রথমার্ধেই অনেকে দিন তারিখ ঠিক করে জাকজমকের সাথে ইফতারী নিয়ে পৌছেন জামাই বাড়ীতে। ইফতার সামগ্রীর মেনুতে মিষ্টি জিলাপী নিমকী খাজা আমির্তি বাখরখানি ছাড়াও মৌসুমী ও দেশী বিদেশী ফল ফলাদি চানা পিয়াজি পোলাও চপ বেগুন ও শাকের তৈরী বিভিন্ন ধরনের বড়া ইত্যাদি দিয়ে সাজানো খা া (বড় থাল) সাজিয়ে নেয়া হয়। আবার কোথাও বরের জন্য বিয়াই বিয়াইনের জন্য এবং মেয়ে ও মেয়ের জা দের জন্য আলাদা করে থাল সাজিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সাধারণত নতুন আত্মীয়তা হলে সাজানো থাল বা খা া নেয়া হয়। উল্লেখ্য বিয়েতে উকিল হলে উকিল পিতার পক্ষ থেকেও ইফতারী দেয়ার ব্যাপক প্রচলন সিলেটে দেখা যায়। অনেকে ইফতারী দেয়ার পূর্বে কৌশলে খবর নেন অন্য বেয়াইর বাড়ী থেকে কোন ধরনের বা কি পরিমান ইফতারী এসেছে। আবার স্বামী বা শ্বশুর শ্বশুড়ী জল্লাদ বা খিটখিটে মেজাজের হলে নয়া কন্যা ফোন করে গোপনে বাপের বাড়ীতে সংবাদ প্রেরণ করেন যে আর কিছু না হোক ইফতার সামগ্রী উন্নত ও পরিমাণে যেন বেশি হয়। কোন কোন বদ মেজাজী পেটুক বা পর সম্পদ লোভী বর বা বরের পিতা ইফতার সামগ্রী একটু কম বা কিছুটা নিম্নমানের হলে রাগ গোস্বা করতেও দেখা যায়। বিগত রমজানে জনৈক ব্যক্তি ইফতার সামগ্রী বিক্রেতাকে বললেন ‘ভাতিজা মালগুলা ভালা দেখিয়া দিবায়, কারণ আমার নয়া লন্ডনী বিয়াই, মিজাজ মর্জি খুব গরম, একটু বাদ অইলে সব খালেদি নিয়া ফালাইদিব আর আমার পুড়িরে হারা জীবন খালি খুটা দিব। টেকা যা লাগেরবো ভাতিজা আমি খাড়া আছি, আমার পুড়ি লন্ডন গেলেগি একজরা নিছিন্তা অইযাইমু, অকন বেটা এক টেনশন’। ইফতার সামগ্রী বাশের তৈরি খাচায় (ঢালা) ভর্তি করা হয় এবং ঢালা ও থাল সুন্দর কাগজ দিয়ে মুড়ানো হয়। বহনের জন্য সাথে লোক নেয়া হয় অথবা ঠেলা বা গাড়ির রাস্তা থাকলে গাড়িতে করে নেয়া হয়। ইষ্টি কুটুম শালা শালী পাড়া পড়শী কচি কাচা সহ লোকজন ইফতারীর সাথে গমন করেন মহা ধুমধামের সাথে। নির্দিষ্ট সময়ে উভয় পক্ষের মেহমান সহ একত্রে ইফতার করেন পরম তৃপ্তি সহকারে। গত ক’বৎসর যাবৎ ব্যক্তিগত সামাজিক রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমেও ব্যাপক হারে ইফতার মাহফিল সংগঠিত হতে দেখা যায়। যা খুবই মনমুগ্ধকর একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। অনেকে নির্বাচনকে সামনে রেখেও এ অনুষ্ঠান করতে দেখা যায় এবং টার্গেট ভিত্তিক দাওয়াত প্রদান করেন। তবে সাধারণতঃ এসব অনুষ্ঠানে গরীব মিছকিনকে দাওয়াত না দিয়ে শুধুমাত্র ধনীক শ্রেণী বন্ধু বান্ধব রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দাওয়াত দেয়া হয়। তাতে দুনিয়াবী ফায়দা হলেও প্রকৃতপক্ষে সওয়াব কতটুকুইবা হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। শুধুমাত্র গরীব দুস্থ ও অসহায়দেরকে এবং একই সাথে ধনীক শ্রেণী বা প্রভাবশালীদেরকেও দাওয়াত দিয়ে খালিছ নিয়তে ইফতার অনুষ্ঠান করলে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার প্রতিফলন ও শতভাগ সওয়াবের আশা করা যেতে পারে। ইফতার মাহফিলের বেশির ভাগ অনুষ্ঠানেই রমজানের তাৎপর্য ও করণীয় শীর্ষক আলোচনা ও ইফতারের পূর্বে সম্মিলিতভাবে ইফতার সামনে নিয়ে মহান আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করা হয়। এ সময়টা দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম সময়। অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে শ্বশুর বাড়ী থেকে ইফতারী আসার দিনেও এ অনুষ্ঠান করতে দেখা যায়। বর্তমান যান্ত্রিক যুগে অনেকে নতুন আত্মীয়ের বাড়ীর ইফতার খাবার জন্য সুদুর প্রবাস থেকেও দেশে আসতে শুনা যায়। আবার অনেকের মেয়ে দেশে না থাকলে লোক মারফত ইফতারীর জন্য টাকা বা পাউন্ড প্রেরণ অথবা আত্মীয়ের মাধ্যমে ইফতারী প্রদান করতে শুনা যায়। সময়মতো ইফতারী দিতে না পারলে কোথাও কোথাও ঝগড়া ঝাটি হতেও শুনা যায়। আবার কোন কোন রাগী লোক রমজানের উপবাসে তাদের মেজাজ বিগড়ে যাবার ফলে বউকে মারধর করেন অথবা বাজারে গেলে অহেতুক ঝগড়া ঝাটি বা মারামারি করতে কার্পণ্য করেননা। এসব ঝগড়াটেদের ভয়ে মেয়ের পিতা জামাইবাড়ীর সকলকে খুশি রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কথায় বলে ‘জামাই বাড়ীর রাস্তায় যদি ঝাড়– ঝুলিয়ে রাখা হয় তবুও নাকি মেয়ের বাড়ীর লোক ঐ ঝাড়–র নিচ দিয়ে যেতে হয়।’
মধুমাসের আম কাঠলীঃ
সাধারণতঃ মধুমাস বলে পরিচিত জৈষ্ঠ্য মাসেই শ্বশুর বাড়ী থেকে জামাই বাড়ীতে আম কাঠাল সহ হরেক রকমের মৌসুমী ফল আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়, যাকে সিলেটের আ লিক ভাষায় বলা হয় আম কাঠলী। সামর্থানুযায়ী আম কাঠাল সহ মৌসুমী ফল ফলাদি পিক আপ লাইটেস ট্রাক টেম্পু টেক্সি সিএনজি ফোর ষ্ট্রোক ঠেলা রিকসা নৌকা আবার কেহবা কাধে করেও নিয়ে যেতে হয় জামাইবাড়ীতে। এ উপলক্ষে উভয় পক্ষের খেশ আত্মীয়দের দাওয়াত করা হয় এবং ভুড়িভোজন করা হয় আড়ম্বর বা অনাড়ম্বরভাবে। ফল ফলাদির সাথে পিঠা খই এবং পাউরুটিও নিতে দেখা যায়। ফল ফলাদির মধ্যে সাধরণতঃ আম জাম কাঠাল লিচু আনারস কমলা আপেল পেয়ারা ইত্যাদি সামর্থমতো নেওয়া হয়। আগেকার যুগে সাধারণতঃ নৌকাযোগে আম কাঠলী নিয়ে যাওয়া হতো জামাইবাড়ীতে। বর্তমান যান্ত্রিক যুগে নৌকা ভ্রমন ক্রমশঃ বিলুপ্ত হচ্ছে। আম কাঠলী ছাড়াও অনেকে বাড়ির গাছের কাঠাল আম জাম ইত্যাদি জামাই বাড়ীতে পাঠাতে কসুর করেননা।
ভাদ্র মাসের খই চিড়াঃ
ভাদ্র মাসে মেয়ের বাড়ীতে খই চিড়া প্রদানের প্রচলন বেশ প্রাচীনকাল থেকেই। আগেকার যুগে ভাদ্র মাস এলেই প্রায় বাড়ীতে চিড়া তৈরীর গাইল ছিয়ার সংগর্ষের শব্দ শুনা যেত। ঘরে মহিলার সংখ্য কম থাকলে পার্শ্ববর্তী ঘর বা বাড়ীর মহিলাদের চিড়া ভাঙানোর কাজে সহযোগীতা করার জন্য আমন্ত্রন জানানো হতো। একজন মাটির হাড়িতে এক গাইলের পরিমান মতো ধান উনুনে ভেজে গরম করে দিত। বাকি দুজন গাইল ছিয়ার সংঘর্ষের মাধ্যমে প্রস্তুত করতো স্বাদের চিড়া। এর ঘট ঘট শব্দ শুনা যেত অনেক দুর থেকে। আগেকার যুগে আমাদের দেশে বহুবিবাহের যথেষ্ট প্রচলন ছিল। জনশ্র“তি আছে অনেকে নাকি চিড়া প্রস্তুতের সুবিধার্থে ২/৩ টি বিয়ে করতেন। বর্তমানে উন্নতমানের চিড়া তৈরির মিল কারখানা থাকায় আর ঘরে চিড়া ভাঙতে দেখা যায়না। বাজারে পাওয়া যায় উন্নতমানের চিড়া। জামাইবাড়ীতে খই চিড়া নিয়ে যাবার সময় চিড়ার সাথে নারিকেল কলা গুড়/চিনি ইত্যাদিও নিতে হয়। তবে আগেকার যুগে নাকি চিড়ার সাথে বাড়ির নিজস্ব পোষা গাভীর দুধথেকে তৈরি দৈ পরিবেশন করা হতো। এতে চিড়ার স্বাদ বেড়ে যেতো বহুগুনে।
অগ্রাণে হাতের তৈরি সন্দেশ পিঠাঃ
অগ্রহায়ন মাসে নবান্নের উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে বাংলার ঘরে ঘরে। কৃষকেরা নতুন ফসল ঘরে তুলে মনের আনন্দে গান গায়। আর মহিলারা অগ্রাণের ধান গোলায় ভরেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন নানান ধরনের পিঠা পায়েস ও সন্দেশ তৈরির কাজে। আগেকার যুগে ঢেকি বা গাইল ছিয়ার মাধ্যমে চালের গুড়া তৈরি করা হতো। বর্তমানে মেশিনের সাহায্যে চাল ভেঙ্গে পিঠা তৈরির কুড়া (গুড়ি) প্রস্তুত করা হয়। এ কুড়া দিয়ে বাহারী স্বাদের পিঠা পায়েস ও সন্দেশ তৈরি করা হয়। তা থেকে বিরাট একটি অংশ গামলায় (বউল) ভরে রুমাল দিয়ে গাট্টি বেধে নিয়ে যাওয়া হয় জামাই বাড়ীতে। সিলেটের আ লিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘দাওয়া কাটা’। জামাই বাড়ীর লোকজন মনের আনন্দে তা ভক্ষন করেন এবং পার্শ্ববর্তী বাড়ীগুলোতেও তা বিলিয়ে দেন। অনেকের মতে পিতার সম্পদে মেয়েরও হক আছে তাই ধানের কিছু অংশ থেকে সন্দেশ পিঠা তৈরি করে মেয়ের বাড়ীতে পাঠানো হয়। সিলেটে যে সব সন্দেশ ও পিঠা তৈরি হয় তার কয়েকটির আ লিক নাম হলোঃ ‘হান্দেশ ছই পিঠা চিতল পিঠা রুটি পিঠা ভাপা পিঠা ঢুপি পিঠা খুদি পিঠা ঝুরি পিঠা পানি পিঠা চুংগা পিঠা তালের পিঠা পাড়া পিঠা নুনের ডোবা নুনগরা এবং নারিকেল সমেত তৈরি পব। ইদানিং কোন কোন মা বাবা তাদের আদরের সন্তানদের জন্য হাতের তৈরি পিঠা বিদেশে পাঠাতেও দেখা যায়।
পরিশিষ্টঃ
ইফতারী আম কাঠলী খই চিড়া সন্দেশ ইত্যাদি বিভিন্ন মৌসুমে জামাইবাড়ীতে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা সিলেটের একটি বহুল প্রচলিত রেওয়াজ হলেও এর যেমন সুফল রয়েছে তেমনি রয়েছে মারাত্মক কুফল। সুফলের মধ্যে উল্লেখ করার মতো হলো এর মাধ্যমে আত্মীয়দের মধ্যে পরস্পর ভাব বিনিময় দেখা সাক্ষাৎ একই সাথে আপ্যায়ন ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। আত্মীয়ের বা মেয়ের বাড়ীতে অন্যান্য সময় যাবার ফুরসত না হলেও এ ধরনের উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে যাবার বা দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয় এবং প্রতিবেশিরাও এতে শরিক হওয়ার সুযোগ লাভ করেন।
অপরদিকে কুফল সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে দেখা যায় অনেক দরিদ্র পরিবার বা মেয়ের বাবা চাপে পড়ে অন্যের কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে বা ধার কর্জ করে অথবা কোন কিছু বিক্রয় করে এসব প্রদান করতে বাধ্য হন মেয়ের সুখ শান্তির জন্য, অথবা স্বামী পক্ষের তিরস্কার থেকে বাচার জন্য। কারন অনেক পরসম্পদলোভী বদমেজাজী ও পেটুক বর বা বরের আত্মীয়স্বজন এসব সময়মতো প্রদান না করলে কনেকে তিরস্কার ও ভৎসনা করেন। কোন কোন নরাধম স্বামী তার স্ত্রীকে শারিরিক ও মানসিক পীড়া দিতেও কুন্ঠাবোধ করেননা। এক্ষেত্রে অনুধাবন করা উচিত যে, যার সামর্থ নেই বা দিন আনে দিন খায় তার জন্য এসব বিলাসিতা মানায়না এবং এসবের কোন প্রয়োজনও নেই। এটা কোন রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় আইনও নয় যে অবশ্যই পালন করতে হবে। সমাজের কোন রসম রেওয়াজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে অপছন্দনীয় না হলে তা যে কেহ পালন করতে পারেন তবে তা বাধ্যতামুলক নয়। লিল্লা ফিল্লা তুলে এসব অনুষ্ঠান করা কোন ক্রমেই সমিচীন নয়। এক্ষেত্রে বর বা তার আত্মীয় স্বজনদের শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। সেজন্য স্ত্রীকে নির্যাতন বা তিরস্কার করলে সংশ্লিষ্ট মহল আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.