বুধবার , 20 জুন 2018
ব্রেকিং

” আমার হোস্টেল জীবন “

চিকিৎসক ফারহানা মোবিন ।

2002 সালের কথা । তখন আমি থাকতাম নগরীর শিকদার মহিলা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে ।

রাজধানীর রায়ের বাজার এ আমাদের মেডিকেল কলেজ । আমাদের মেডিকেল কলেজের campus টা তখন ছিল view card এর মতো সুন্দর । এখনো ভীষণ সুন্দর । তবে সেই সময় ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আরো বেশী ভরপুর ।

মেডিকেল কলেজের শিকদার apartment এর পেছনে দেখা যেত নদী । ছোট্ট বেলা থেকেই নদী আমার ভীষণ প্রিয় । নতুন যখন হোস্টেলে উঠলাম, তখন কারো মা বাবা কে দেখলেই মনটা খারাপ হয়ে যেত । আমার মন চলে যেত রাজশাহীতে আমার মা আর ভাই বোনের কাছে ।

বৃহস্পতি বারে class করে অসংখ্য ছাত্রী বাসায় চলে যেত ।গভীর রাত পর্যন্ত কেউ পড়তো , কেউ গান শুনতো , আবার অনেকে তাদের বন্ধুদের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতো । আমি অবসর পেলেই নেশার মতো লিখতাম । খুব মন খারাপ হলেই লিখতে বসতাম । লিখলে আমার মন ভালো হয়ে যেত ।

আমার হোস্টেল জীবনের প্রথম রুম মেট ছিল নীলা । আমরা সবাই ছিলাম জেড টেন batch এর । আমার অনেক উপকার সে করেছে । আবছা ভাবে মনে হচ্ছে, তার কাছে প্রথম চেয়েছিলাম মশারী বাধার ফিতা ।

একটা ছোট্ট বিছানা, একটা পড়ার টেবিল আর ছোট্ট একটা লকার নিয়ে শুরু হয়েছিল আমার সংসার । হোস্টেলের সংসার । আর সে সংসারের সংগী ছিল অনেক গুলো মোটা মোটা মেডিকেল কলেজের বই , ফুল এক সেট কংকাল । পড়ালেখার সুবিধার জন্য পুরো একটা মানুষের কংকাল ছিল আমাদের সবার সংগী ।

Anatomy দিয়ে শুরু হয় মেডিকেল কলেজের first year । দল বেঁধে সবাই মরা মানুষের হাড় নিয়ে পড়তে বসতাম ।

একসময় আমার রুমমেট হয়ে উঠল আরো পাঁচ জন । একেক টা রুমে আমরা ছয় জন একসাথে থাকতাম ।যে মানুষ গুলো ছিল আমার সুখ দুঃখের অংশীদার ।

আমার home district রাজশাহী । মেডিকেল কলেজের ছুটি ছাড়া আমি রাজশাহী যেতে পারতাম না ।আমার রুমমেট বাকি পাঁচ জনের বাসা ছিল ঢাকা আর নোয়াখালী তে ।

তখন আমি ঠিক মতো খেতে পেতাম না । হোস্টেলে অনেকেই রান্না করতো । আমরা রান্না করতে পারতাম না । 264 নং রুমে ছিল আমাদের সংসার ।

আমাদের সবার মাঝে ছিল মধুর সম্পর্ক । আমরা সবাই ভালো কোন খাবার ভাগ করে খেতাম । তখন ঢাকায় নতুন এসেছিলাম । সবাই একসাথে বেড়াতে যেতাম ।

ঠিক মতো খেতে পেতাম না । মহিলা হোস্টেলের অনেক কড়া নিরাপত্তা ছিল । তখন আমাদের মেডিকেল কলেজের পাশে এতো দোকান ছিল না । সন্ধ্যা হলেই হোস্টেলের পেছনের দিকে শুনতে পেতাম ঝি ঝি পোকার আওয়াজ ।

চোখ বন্ধ করলেই আমি সেই শব্দ আজও শুনতে পাই । আজো দেখতে পাই , হোস্টেল সুপার ‘ উন্নতি আপা ‘ র তদারকি ।

চোখের নিমেষেই বয়ে গেল অনেক গুলো বছর ।তবু যেন মনে হয় , আমি এখনো হোস্টেলের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি । এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছি নদীর অপরূপ সৌন্দর্য ।

বন্ধু তোদের কে আমি খুব মিশ করি । এখনো মাঝে মাঝে দেখতে পাই , আমার রুমমেট কেউ ওয়াটার হিটার দিয়ে চা বানাচ্ছে । কেউ নামাজ পড়ছে । আর কেউ tired হয়ে গাইছে , ” পড়ার নাম বেদনা, একথা বুঝিনি আগে ……….। “

হোস্টেলের পেছনের রেলিং ধরে আমি প্রায়ই দাড়িয়ে থাকতাম । নদীর ঢেউ দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যেত ।

আজকের এই আমি টা ভীষণ যান্ত্রিক । নদীর ঢেউ দেখার আর ঝি ঝি পোকার আওয়াজ শোনার সময় নেই ।

তবু খুব ইচ্ছে করে, ওয়াটার হিটার আর টি pack দিয়ে বানানো চা খাওয়ার জন্য । বন্ধু তোদের কে আমি খুব খুব miss করি ।

2017 এর ডানায় ভর করে , আমার মন উড়ে চলে যায় 2002 এর হোস্টেল জীবনে ।

আমার মনের মন্দিরে এখনো আমার সেই রুমমেট, আমার মেডিকেল কলেজের campus, আমার সেই প্রিয় নদীর ঢেউ ।

চোখ বন্ধ করলেই , আমি এখনো দেখি , আমি দাঁড়িয়েই আছি হোস্টেলের রেলিং ধরে ।

আমি প্রিয় মেডিকেল কলেজ , তোমার প্রতিটি ইট পাথরের সাথে জড়িয়ে আছে আমার অনেক আনন্দ বেদনার গল্প ।

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.