বুধবার , 19 সেপ্টেম্বর 2018
ব্রেকিং

প্যারিসে রিপাবলিক চত্বরে একুশে পালন এবং কিছু দিনহীন লিপি

কবি লেখক আবৃত্তিকার রবিশঙ্কর মৈত্রী

প্যারিসে একুশে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। সকালবেলায় মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। একুশের শোকে, বিষাদে, ব্যাহত আহত চেতনায় কেমন বিপন্ন আমি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে দশ সহস্র কিলো মিটার দূরে প্যারিস মহানগরীর পাথরভাস্কর্যময় চত্বরে উদ্যানে সড়কদ্বীপে প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহে ম্লান ম্রিয়মাণ আমি। তবুও সকল কুণ্ঠা ভেঙে, সকল বেদনাকে উষ্ণতায় মুড়িয়ে রওনা হলাম ওভারভিলিয়ের পথে।

শিল্পকারখানার ফাঁকে ছোট্ট খালপাড়ের পত্রহীন-বৃক্ষশোভিত উদ্যানে অস্থায়ী শহিদ মিনারে মধ্যাহ্ন আলোয় আয়োজিত হল পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন উদীচীর আয়োজনে। বুকের ভেতর মুচড়ে উঠল বারবার। অকস্মাৎ মঞ্চ থেকে উদীচী সভাপতি কিরণময় মণ্ডলের ডাকে বুকের ব্যথাটা লঘু হয়ে এল। মিনিট দুয়ের ভাষাশহিদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাবচন শেষে ছুটলাম গার দু ন’ স্টেশনের পাশে রেজা ভাইয়ের রেস্তরাঁর দিকে। দুপুরের আহার আজ আবু হাসানের সৌজন্যে। সঙ্গে প্রথম আলো বন্ধুসভার আশরাফউদদীন চয়ন।

একুশের শোক থেকে সঞ্চিত হল শক্তি– রুটি আর তরকারি আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দিল, মনে করিয়ে দিল ঢাকার আহার বিহার।

ভাটিবেলায় পা বাড়ালাম রিপাবলিক চত্বরের পথে। মেট্রো পাঁচের পাতাল থেকে ভূউপরি হতেই শুনি আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।

রিপাবলিক চত্বর অগণিত বাঙালির মত্তকণ্ঠস্বর। নারী শিশু কিশোর কিশোরী তরুণ তরুণী মাঝবয়সী এবং প্রৌঢ় বাঙালির সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের উত্তাপে প্যারিসের শীত পালিয়ে গেল। বাংলাভাষার প্রতি প্রবাসী বাঙালির উষ্ণতায় আমি ঘামতে শুরু করলাম।

প্যারিস মহানগরীও আচমকা রোদেলা হয়ে উঠে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরল যেন। সহস্র কণ্ঠে গীত হল একুশের গান। নয়ন, বাবু এবং আবু তাহির আমাকে গভীর প্রশ্রয়ে শব্দযন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। শিল্পী ও কবি সুমা দাস আমার পাশে স্বকণ্ঠে দণ্ডিত হলেন।

সালাম আসছে বরকত আসছে রফিক আসছে তাজুল আসছে, একুশে মানেই আসছে– ক্রমাগত একুশের কবিতা উচ্চারণ করতে করতে ভুলে গেলাম কোথায় আছি আমি?

আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং অন্যান্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা কর্মী সাধারণ সদস্য, অচেনা আধচেনা সাধারণ নিরীহ প্রবাসী– সকলে একে একে অস্থায়ী শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। আমার বুকের মধ্যে উথাল পাতাল ঢাকা, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। এই পরবাসে কেউ যেন আমার ভেজা চোখ না দেখতে পান, কেউ যেন আমার হৃদপিণ্ডের দুরুদুরু শুনতে না পান– আমি অতি সাবধানে রিপাবলিক চত্বর থেকে দ্রুত হারিয়ে গেলাম। মেট্রো নয় ধরে পৌঁছে গেলাম ত্যুর ইফেলের উত্তরে মানবাধিকার চত্বরে।

অাইফেল টাওয়ারকে পেছনে রেখে মানবাবিধকার চত্বরে অস্থায়ী শহিদ মিনারে এবারের আয়োজন মৃদুনালোকিত। অকালপ্রয়াত শহিদুল আলম মানিক ভাইকে মনে পড়ল বারবার। এখানে খুঁজলাম কাজী এনায়েতউল্লাহ ইনু ভাইকে, রেজা ভাই-সহ আরো অনেককে। পৌঁছতে আমার দেরি হয়েছে বলে হয়তো অনেককেই পেলাম না। পেলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী কবি শাহাদাৎ হোসেন শালাস্কোকে, পেলাম প্রিয় মুখ সেলিম ভাইকে, সুব্রত শুভকে এবং আমার আনন্দ্রাশ্রয় শিল্পী কুমকুম আর রানাকে।

অস্থায়ী শহিদ মিনার থেকে একটু দূরে ক্যাফে বারে কফিপানের আসর বসল। আমিও সমিল শামিল তখন। ভাবলাম– আলেস থেকে চার দিন আগে প্যারিসে এসে এবার প্রবাসী বন্ধুদের ভালোবাসায় ক্রমশ আমার একাকী-মানুষের পাষাণভার কমে গেছে।

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ফ্রান্স কমিটি আয়োজিত বইমেলায় রমেন্দ্র কুমার চন্দ, রিপন, সুজন, শাওনের আন্তরিকতায় রোদেলা নতুন সকাল, মুক্তিযোদ্ধা জামিরুল ইসলাম মিয়া স্নেহ, কবি চলচ্চিত্রকার আমীরুল আরহামের সাহস, শিল্পী সাগর বড়ুয়ার প্রেরণা– আমার পাথেয়। অগ্রজ চাণক্যবন্ধু অরুণ হালদার এবং রাহুল চৌধুরী, বিভা রাণী বিশ্বাস, কিশোর বিশ্বাস, মাহমুদ দোলন, অলকা বড়ুয়া, শরিফ আহমেদ সৈকত, আবৃত্তিকার নিঝুম, বদরুজ্জামান জামান, কেয়া জোয়ার্দার, মেহেদী, আশরাফউদ্দীন চয়ন-সহ আরো অনেকের সঙ্গ আমাকে নির্বাসিত জীবনের কষ্ট লঘু করে দিয়েছে।

সংস্কৃতিমুখী প্যারিসপ্রবাসী সকল বাঙালির কাছে আমার ঋণ অন্তহীন।

২৩শে ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আলেস, ফ্রান্স

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.