মঙ্গলবার , 17 জুলাই 2018
ব্রেকিং

ফরিদপুর-১ আসনে তৃণমূলে দোলন এগিয়ে আবদুর রহমানের জনপ্রিয়তায় ভাটা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সময় গড়াচ্ছে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা। দেশের সবকটি দলের অংশগ্রহণে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়ে জনমানুষের মধ্যে শঙ্কা খুব একটা নেই। সবাই ধরেই নিচ্ছে দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও নির্বাচনে যাবে। আর তেমন ইঙ্গিতই রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, ‘যাই হোক না কেন বিএনপি নির্বাচনে যাবে- সেটা হিসাব করেই আমাদের দলের নেতাদের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে কাজ করতে হবে।’

তিনি এও বলেছেন, ‘জনগণ চাইলে আমরা আবার দেশ পরিচালনায় আসব, না চাইলে নয়।’ জাতীয় রাজনীতির এই অবস্থায় সারাদেশেই চলছে বড় দলগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়-ঝাঁপ।

দেশের দুটি জনপ্রিয় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-এতে কারোরই সন্দেহ নেই। ফরিদপুর-১ আসন তথা আলফাডাঙ্গা-মধুখালী ও বোয়ালমারীর এই আসন থেকে ওই দুই দল হতে অনেকেই মনোনয়ন চাইছেন। এখানে ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগে ত্রিভুজ আর বিএনপি থেকে দ্বিমুখী লড়াই চলছে। কারা পাচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন? সেটা সময়ই বলে দেবে।

তবে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের হরেক রকম পদক্ষেপে এই আসনটি ঘিরে এখন তুমুল আলোচনা চলছে। নেপথ্য কারণ হিসাবে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান তার ইমেজ হারিয়েছেন। তৃনমূল নেতারা তাকে এবার সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চাইছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মূলত তিন নেতার হরেক রকমের প্রচারণা। ব্যানার, ফ্যাস্টুন ও বিলবোর্ডে সজ্জিত রাজপথের দুধার। গভীর রাত পর্যন্ত দু-একজন নেতার গণসংযোগও চোখে পড়েছে। এদিকে ওই তিন নেতা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুর রহমান, ব্যবসায়ী কাজী সিরাজ- যিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। তৃতীয়জন হলেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক আরিফুর রহমান দোলন। তাদেরকে সামনে রেখেই চলছে এখন দলীয় মনোনয়নের লড়াই।

দেখা গেছে, কয়েকবছর ধরে এলাকায় ঘন ঘন গিয়ে সামজিক সমস্যা নিরসনে ভূমিকা রেখে সাংবাদিক আরিফুর রহমান দোলন চমকে দিয়েছেন সবাইকে। তার ওপর এই এলকার মানুষের আস্থা বেড়েছে। এমনিতেই ফরিদপুরের নেতৃস্থানীয় অভিভাবক পর্যায়ের নেতা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সত্তা ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নিকটাত্মীয় হিসেবে সব মহলে পরিচিত আরিফুর রহমান দোলন। ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তাই উন্নয়নের মহাসড়কে একজন পথিক হয়ে দোলন যেন ফরিদপুর-১ আসনের মানুষগুলোর দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। যেটা অবাক করার মতোই।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে দলের তুখোড় বক্তা আবদুর রহমান শুধু ভাষণ আর স্লোগান দিয়ে গেছেন। নিজ এলাকায় দারুণ কিছু করতে পারেননি। বরং দোলন সংসদ সদস্য না হয়েও এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। যেন ঘুম কেড়ে নিয়েছেন দুই দলের জন্যই। এমন চাউর আছে যে, সব দলের অংশগ্রহণে একটা অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আরিফুর রহমানই কেবল বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী শাহ আবু জাফরকে হারাতে পারবেন। যদিও এই আসন হতে বিএনপি থেকে কে মনোনয়ন পাবেন তা নিশ্চিত নয়। কারণ হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার নাসিরুল ইসলামও বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন। তার প্রচারণাও চোখে পড়েছে। আছে পোস্টার-ব্যানার এবং নিজে গণসংযোগও করছেন।

আবদুর রহমান কেন পিছিয়ে গেছেন এর কারণ হিসেবে নিজ দলের তৃণমূল পর্যায় হতে বলা হচ্ছে, তিনি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সঙ্গে গেল পাঁচ বছরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলেও অনেকের মত। তিনি নিজ দলের জ্যেষ্ঠদের মূল্যায়ন করেন না বলেও অভিযোগ আছে। এলাকায় এসেছেন কম, বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেছেন। এতে করে নিজ দলের মধ্যেই তার ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে।

আলফাডাঙ্গায় আবদুর রহমানের সৎ ইমেজটা এখন আর নেই। অন্যদিকে, বোয়ালমারীতে গিয়ে জানা গেছে, তিনি পেশিশক্তি ব্যবহার করে এমন কিছু কাজ করেছেন যা এলাকাবাসী ভালোভাবে নেয়নি। অন্যদিকে, মধুখালীর সন্তান হিসেবে আবদুর রহমানের এখানে জনপ্রিয়তা থাকলেও এখন বেশ কমেছে। আবদুর রহমান নিজেও তার অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত। আসনটিকে পুনরায় পেতে হলে যা করার দরকার ছিল তা তিনি করতে পারেননি। তিন উপজেলার দলের মধ্যকার সমন্বয়ও কম। কমিটি নিয়ে বিরোধ আছে।

এই প্রসঙ্গে তৃনমূল পর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘তিনি দলে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েও ঘর ঠিক করতে পারেননি। তিনি নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন।’ ওই নেতার পাশে থাকা আরো ৩ জন নেতা বলেন, ‘আমাদের সুযোগ থাকবে কথা বলার। কারণ দলের সভানেত্রী বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি তৃণমূলের রায় নিয়েই মনোনয়ন দেবেন। আর যারা অবৈধ পন্থায় টাকা উপার্জন করেছেন তাদেরকে তিনি মনোনয়ন দেবেন না। কাজেই আমরা তা তুলে ধরব।’

এদিকে আওয়ামী লীগ থেকে আরও মনোনয়ন চাইছেন একবার আওয়ামী লীগ ও অন্যসময় বিএনপি থেকে মনোনয়ন দাবিদার কাজী সিরাজুল ইসলাম। তিনিও ছুটছেন। এলাকায় সভা-সমাবেশ করছেন। অর্থকড়ি দিয়ে তিনি তৃণমূলের মন জয় করার চেষ্টায় ব্রত থাকলেও তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এসনকি এলাকার মানুষের আস্থাও শক্তিশালী পর্যায়ে নেই। এখনো এলাকাবাসী প্রশ্ন করেন তাকে, ‘আপনি কোন দল থেকে লড়বেন?’

অন্যদিকে, প্রায় একই সমস্যায় আছেন বিএনপির অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশী শাহ আবু জাফর। তিনিও বিএনপির সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মন জয় করতে পারেননি। সেই সুবাদে বরং খন্দকার নাসিরুল ইসলাম দলের জন্য ভাল নেতা বলে আদৃত। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, শ্রমিক নেতা হিসাবে শাহ আবু জাফরের ব্যক্তিগত রিজার্ভ ভোট আছে।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল এখন অপেক্ষারত। মূল দল ও সহযোগী এবং সমর্থিত সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা দলের হাইকমান্ডকে অনেক কিছু বলতে চান। আর সে সময় দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকেই তারা মনের কথা বলতে চান। তাদের জন্য আদর্শ প্রার্থী কে- এমন কথা জিজ্ঞেস করা হলে তারা এড়িয়ে যান। তবে তাদের কথার আবহে আরিফুর রহমান দোলন ও আবদুর রহমানের মধ্যকার মনোনয়নের লড়াই স্পস্ট।

এখন বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর চলছে। সঙ্গত কারণেই দেশে রাজনৈতিক উত্তাপ কম। তবে ভেতরে ভেতরে চলছে সব ধরণের প্রস্তুতি। রাজনৈতিক দলগুলো হিসাব-নিকেশ করেই তাদের প্রার্থী ঠিক করছেন। আগামী মাস খানেকের মধ্যেই ৩০০ সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে ফেলবে বলে সূত্রগুলো দাবি করছে। যদিও ১৪ দল হতে মহাজোট হবে কিনা তা সময়ই বলবে।

অন্যদিকে ২০ দলীয় জোট শেষ মুহূর্তে ভেঙে গেলেও নির্বাচনের হিসাব আলাদা হয়ে যাবে। দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন, বি চৌধুরী ও আসম আবদুুর রবেরাও কী করতে যাচ্ছেন তা নিয়েও দৃষ্টি রাখার অবকাশ আছে।

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এবার আমরা সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, খেলোয়াড় ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের জন্য কোটা রাখব। তাদের অনেকেই দলের মনোনয়ন পাবে। সেই ধারাবাহিকতায় ফরিদপুর-১ আসন থেকে আরিফুর রহমান দোলন মনোনয়ন পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.