শনিবার , 15 ডিসেম্বর 2018
ব্রেকিং

প্যারিসে উদীচীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পুরনো একটি গান এবং কিছু মানুষের কুৎসিত অপপ্রচার -সেজান মাহমুদ

পার্থপ্রতিম মজুমদার একজন বিশ্বখ্যাত মূকাভিনেতা-সেজান মাহমুদ

সম্প্রতি আমার প্যারিস সফরের সময়ে উদীচী’র একটি ছোট্ট বৈঠকে আমাকে সংবর্ধণা দেয়া হয়। সেই অনুষ্ঠানে আমি প্রায় ২০ বছর আগের লেখা একটি গান গাই। সেই গানটি গাইবার প্রেক্ষিত ছিল যে আগে রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্নক গান লিখে বিটিভিতে প্রচার করতে না পারলেও তা আওয়ামীলীগের নেতা বা মন্ত্রীদের সামনে গেয়েছি কিন্তু তাঁরা বড়জোর বলতেন “আপনারা লেখকেরা শুধু রাজনীতিবিদদের খোঁচান। আমাদের ভালটাও লিখেন”। কিন্তু এখন নেতারা কম সহনশীল। এই গানটি ছিল দুই রাজনৈতিক দলের ২০ বছর আগের রেষারেষি নিয়ে-
” খিল্লি খিল্লির মুল্লুকেতে থাকতো নাকি দুই বেড়াল একটা শুধায় আরেকটাকে তুই বিড়াল না মুই বিড়াল”।

এরপর ঢাকা ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে নিয়ে গানটি গাইঃ
“তবু ভালবাসি আমাদের ঢাকা…
এখানে রাজপথে দুরন্ত মিছিলে ছুটে আসে কেউ
রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠ ভাসে
বঙ্গবন্ধু যেন কবিতার ঢেউ।

‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’

ধূলিকণা, ঝরাপাতা দেয়াল লিখনে
রক্তের আলপনা আঁকা।
“তবু ভালবাসি আমাদের ঢাকা… ”

সবশেষে সবার অনুরোধে “নেলসন মেন্ডেলা গানটির অংশবিশেষ গাই।

কিন্তু প্যারিস প্রবাসী এক শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে পুরো অনুষ্ঠান থেকে শুধু কয়েকটা লাইনের ভিডিও নিয়ে এভাবে প্রচার চালায় বা চালাচ্ছে যে প্যারিসে মূকাভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদারের আতিথেয়তায় আমি প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী তনয় জয় কে নিয়ে কটুক্তি করেছি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে। এখানে গানটিকে সম্পূর্ণ “আউট অব কনটেক্সট” বা প্রসঙ্গের বাইরে এনে দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার করা হয়েছে। পুরো বিষয়টিতে বরেণ্য মূকাভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদার, ঐতিহ্যবাহী সংগঠন উদীচীকে হেয় করার চেষ্টা সেই সঙ্গে আমাকে হেয় করার ঘৃণ্য ও অসৎ প্রচেষ্টা লক্ষ্যনীয়। কয়েকটি বিষয় একেবারে খোলাসা করে বলতে চাই এখানেঃ

এক। আমি ইউরোপে কারো অতিথি হয়ে যাইনি। কোন বাঙালির আমন্ত্রণেও যাইনি। আমি গিয়েছিলাম “ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর মেডিক্যাল এডুকেশন” এর আমন্ত্রণে বাৎসরিক সভায় যোগ দিতে একজন আন্তর্জাতিক সদস্য হিসাবে। সেখান থেকে ইতালি এবং প্যারিস ভ্রমণ করতে যাই আমার পুরো পরিবারসহ। যেখানে আমি আমার ভাড়া করা এপার্টমেন্টে থেকেছি, কারো অতিথি হয়ে থাকিনি।। পার্থপ্রতিম মজুমদার একজন বিশ্বখ্যাত মূকাভিনেতা, শিল্পী যিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান “নাইট” উপাধি পেয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে একুশে পদক পেয়েছেন। তিনি আমাদের পারিবারিক বন্ধু, বড় ভাইয়ের মতো এবং গুণীজন যার সঙ্গে দেখা হবেই। শিল্পী শাহাবুদ্দীন আহম্মদ থাকলেও হয়তো দেখা করতাম। আমাদের উপস্থিতির কথা জেনে উদীচীর পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয় যে আমরা একটি ছোট্ট সংবর্ধণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবো কী না। উদীচী এধরণের গুণীজন সংবর্ধণা অনুষ্ঠান আগেও করেছে। পার্থদা সেখানে আমাকে নিয়ে গেছেন মাত্র। সেখানে আমি দেড় ঘণ্টা আমার কাজকর্ম, লেখালেখি নিয়ে কথা বলি এবং প্রশ্নের উত্তর দিই। । গানের আসরের কোন কথাই ছিল না। আড্ডার এক পর্যায়ে আমিই গান শুনতে চাই স্থানীয় সবার কাছে এবং পার্থদার গান শুনতে চাই, যিনি সেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগে গান গাইতেন, আমাদের মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ডেও গান করেছেন। এখানে আমি কী গান করছি বা করবো তা কেউ যেমন জানতো না বা কারো নিয়ন্ত্রণে ছিল না তাই আমার গানকে কেন্দ্র করে পার্থপ্রতিম মজুমদার বা উদীচীকে টেনে এনে অশ্লীল গালিগালাজ শুধু অন্যায়ই না, ঘৃণিত অপরাধ।

দুই। বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ছড়া লিখেছি, তেমনি নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানের পরে ক্ষমতায় গিয়েই ছাত্রদেরকে হুমকি দেয়াতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়েও ছড়া লিখেছি –

” এরশাদ তো গেলো, এখন দেবে কে বাঁশ?
গণতন্ত্রের রুজ-লিপিস্টিক, পালটে শুধু লেবাস”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডিস্কোর্সে ব্যঙ্গাত্নক ছড়া, কবিতা, গান নতুন কিছু নয়। বরং এগুলো সুস্থ গণতান্ত্রিক এক্সপ্রেশন যা বাংলাদেশ কে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ বানিয়েছে, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান বানায়নি।

তিন। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু নিয়ে আমার পুরো জীবনকে বাজী রাখতে পারি। আমার সারা জীবনের কাজই তা প্রমাণ করে। মুক্তিযুদ্ধের নৌকম্যান্ডোদের সত্য ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম উপন্যাস “অপারেশন জ্যাকপট” থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছি। স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কে ” ঢোল ঢোল ঢোল কিসের ঢোল” বলে ঘোষকের এলান করা এবং রাজার হয়ে ঘোষণার দেয়ার এই তুলনা করে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে প্রতিষ্ঠার এইসব লেখাগুলো আমারই লেখা। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে নতুনভাবে বিচার করার তাত্ত্বিক লেখাও আমার। তাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি? ফাজলামির একটা সীমা থাকা উচিত।

চার। গানটিতে সুধাসদন এবং হাওয়া ভবনের কথা আছে। তাতে অনেকেই দুঃখ পেয়েছেন এই ভেবে যে আমি সুধাসদন এবং হাওয়া ভবনকে এক করে দেখালাম। এটা কোন কথা হলো? গানটি লেখা হয়েছে এরশাদের পতনের পর দুইদলের মারামারি, ঝগড়া বিবাদকে কটাক্ষ করে। এটা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে লেখা বা বলা।
এই ২০ বছরে ইতিহাস অনেক পালটে গেছে এবং একজন শিক্ষিত, নির্দলীয়, বুদ্ধিমান, আধুনিক মানুষ হিসাবে আওয়ামীলীগকে প্রশংসার সময়ে প্রশংসা করেছি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সমকক্ষ কাজ বলাতে অনেকেই আমাকে গালিগালাজ করেছেন, আওয়ামীলীগের দালালি করি বলেছেন। আবার বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রেরণ, স্বাস্থ্য সূচকে এশিয়ায় অন্যতম করার জন্য আওয়ামী লীগকে যেমন প্রশংসা করে লিখেছি, তেমনি ক্রসফায়ার, গুম, ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।

পাঁচ। আর এসব আমি করি কোনকিছুর আশা না করে। বাংলাদেশকে যারা ভালবাসেন তাঁরা কি অস্বীকার করতে পারবেন, একটি গঠনমূলক সমালোচনা , আত্নসমালোচনার সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্যে কতোটা জরুরী? যারা প্যারিসে প্রবাসী তাঁরা রুশো, ভলতেয়ারের দেশে থেকে সেই সামান্য সহনশীলতা না শিখলে আপনাদের মতো লোকেরাই আওয়ামীলীগের ভাবমূর্তীকে নষ্ট করবে একটি অসহনশীল, উগ্র এবং নির্যাতনের দল হিসাবে ইমেজ তৈরি করে।

পরিশেষে বলবো, আমি যা লিখি তার প্রতিটি অক্ষরের জন্যে নিজস্ব দায় নিতে প্রস্তুত। এরসঙ্গে অন্যদের জড়াবেন না। পার্থ প্রতিম মজুমদারের মতো মানুষেরা বাংলাদেশের সম্পদ। উদীচীর মতো সংগঠন আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার মতো সেজান মাহমুদ হয়তো হাজারটা জন্ম হবে বাংলাদেশে কিন্তু পার্থ প্রতিম মজুমদার কোটিতে একজন হন। তাঁদের অসম্মান করা অর্থ বাংলাদেশ কে অসম্মান করা। দয়া করে সেই অসম্মান থেকে বিরত থাকুন।


সম্প্রতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু , এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং উনার সন্তানকে নিয়ে প্যারোডী গান পরিবেশন করেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী চিকিৎসক ও লেখক ড. সেজান মাহমুদ। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক সেজান মাহমুদ সম্প্রতি প্যারিসে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এ ব্যঙ্গাত্মক গানটি পরিবেশন করেন। সে সময় প্যারিস প্রবাসী একুশে পদকপ্রাপ্ত মুকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুমদার, উদীচী নেতৃবৃন্দ ও ফ্রান্স আওয়ামী লীগ এর উপদেষ্টা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গানটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

প্রসঙ্গত, চিকিৎসক সেজান মাহমুদের সে গানের কথাগুলো হলো, ‘ এক বেড়ালের পিতার গরম, আরেক বেড়ালের স্বামী, জনগনের সুখের চেয়েও তাদের কথা দামী।নিজেরই ঘর সামলাতে হায় দুই বেড়ালই বেসামাল।সূধা সদন – হাওয়া ভবন দুই বেড়ালের ঘাটি, সেই ভবনের পবন পেতে ছাড়ছি ভিটে মাটি। অন্ধকারের হোলি খেলায় রাজ্যটা যে বেসামাল, তবু একটা সুধায় আরেকটাকে তুই বিড়াল না মুই বেড়াল।

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.