মঙ্গলবার , 18 ডিসেম্বর 2018
ব্রেকিং

সিলেট ১ – আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিয়ে ধোঁয়াশা, ইনাম চৌধুরীতে সন্তুষ্ঠ বিএনপি


সিলেটে ঘর গোছাতে পারছে না আওয়ামী লীগ। ভোটের ঠিক আগ মুহূর্তে মর্যাদার সিলেট-১ আসনে নিজেদের প্রার্থী ঠিক করতে পারছে না দলটি। হাইকমান্ড থেকে প্রাথী হিসেবে অর্থমন্ত্রীকে চাইলেও তিনি নির্বাচনে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। নিজের জায়গায় ছোট ভাই ড. এ কে মোমেনকে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছেন তিনি।

এদিকে বিএনপির প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। মর্যাদার এ আসনে প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হচ্ছেন তা অনেকটা নিশ্চিত। দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র দাবি করছে সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সংকট রয়েছে। সে তুলনায় ইমেজ সম্পন্ন প্রার্থী হিসেবে ইনাম আহমেদ চৌধুরীর বিকল্প দেখছে না দলটি। ঐক্যফ্রন্টও ইনাম আহমেদ বিষয়ে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে।

অপর দিকে সিলেট-১ আসনে প্রার্থিতা নিয়ে দোলাচলে রয়েছ আওয়ামীলীগ। মুহিত না মোমেন এমন ধোঁয়াশা এখন সিলেটে। আর এটা সৃষ্টি করছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। প্রতিনিয়তই মত পাল্টাচ্ছেন।একবার বলছেন নির্বাচন করবেন, আরেকবার না। দলের হাইকমান্ড তার প্রার্থিতার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিলেও তিনি নিজেকে ‘ডামি’ প্রার্থী বলে জানান দিচ্ছেন। নিজে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন আবার ছোট ভাই ড. মোমেনকেও নিজের উপহারের টাকা দিয়ে মনোনয়ন ফরম কিনিয়েছেন। মনোনয়ন ফরম কেনার আগে, কেনার সময় এবং সর্বশেষ মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার পরও বলছেন তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না।

সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি গত এক দশক ধরে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই এক দশক তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে বেশ সফল। গত কয়েক বছর ধরে তিনি অবসরে যাওয়ার কথা বলে আসছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হতে এই আসনে তৎপরতা দেখাচ্ছেন সহোদর ড. এ কে এ মোমেন। অর্থমন্ত্রী নিজেও ভাইয়ের প্রার্থিতার ব্যাপারে অনেকটা খোলামেলা কথা বলেছেন। মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার পরও বলছেন, এ আসন থেকে তার ভাই মনোনয়ন পাচ্ছেন, তবে এটি চূড়ান্ত নয়। সর্বশেষ সিলেটে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, ‘আমি নমিনেশন পেপার পার্টিতে সাবমিট করেছি অ্যাজ এ ডামি ক্যান্ডিডেট, কারণ আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়েই প্রার্থিতা নিয়ে এরকম করছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমি যা করছি প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েই করছি। আমাদের দেশে মুশকিল যেটা হয়, নোবডি ওয়ান্টস টু রিজাইন। আমি অবসরের রীতি চালু করতে চাই। তিনি বলেন আমার আসন থেকে মনে হচ্ছে আমার ভাই প্রার্থী হবে।

তবে ধোঁয়াশার সূত্রপাত ২০১৬ সাল থেকে। সে বছরের জুন মাসে সচিবালয়ে সিলেট সংক্রান্ত একটি বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আচমকা একটি ঘোষণা দেন। সাফ জানিয়ে দেন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না। সে দিনের ওই বৈঠকে আরেকটি বোমা ফাটান অর্থমন্ত্রী। জানান, এ আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারই ছোট ভাই ড. এ কে আবদুল মোমেন। আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন ঘোষণায় সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নানা হিসেব শুরু হয়। এরই মাঝে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন তাঁর ভাই ড. মোমেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ২০১৫ সালের শেষের দিকে দেশে ফেরার পর ড. মোমেন ধীরে ধীরে সরব হতে থাকেন রাজনীতিতে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রতিদিনই উপস্থিতি জানান দেন তিনি। সিলেট-১ আসনের লড়াইয়ে প্রার্থী হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন মোমেন। অর্থমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পর আজ অবধি মাঠে আছেন তিনি। নির্বাচনের লক্ষ্যে সংগ্রহ করেছেন দলীয় মনোনয়ন ফরমও। ওদিকে অনাগ্রহ সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রী নিজেও মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। দুই ভাইয়ের একসাথে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহেই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা । আদৌ কে আসবেন নির্বাচনে প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে সিলেটবাসীর হৃদয়ে।

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকেও এখনো বিষয়টি পরিষ্কার করা হচ্ছে না। যে কারণে সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নিয়ে চরম ঘোলাটে পরিবেশ বিরাজ করছে। একাধিক সূত্র বলছে অর্থমন্ত্রী না হলে ড. মোমেনকেই প্রার্থী করা হবে। ওদিকে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ সিরাজ এবং সিলেট নগর সভাপতি সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানও মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে সবাই তাকিয়ে সভানেত্রী শেখ হাসিনার দিকে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় কার নাম আসছে সে দিকেই নজর এখন পুরো সিলেটের। তবে বিএনপি থেকে ইনাম আহমেদ চৌধুরী আসলে দৃশ্যপট পাল্টে যাবে বলে মনে করছেন অনেকে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করছেন ইনাম আহমেদ ইমেজ সম্পন্ন প্রার্থী। সে জায়গায় অর্থমন্ত্রী আসলে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। কারণ ড. মোমেনে অবিশ্বাস আছে খোদ দলের ভেতরেই। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই ড. মোমেনকে চাচ্ছেন না। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মোমেনকে ঘিরে অদৃশ্য এক গ্রুপিংয়ের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে সিলেট আওয়ামী লীগ। নেতায় নেতায় দলাদলি চলছে। সিলেট -১ আসনে মোমেন আসলে সিটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে এমন আশংকাই করছেন অনেকে। কর্মীরাও রয়েছেন বেকায়দায়। কে কার পক্ষে তাও বোঝা যাচ্ছে না। সবাই সবার, কিন্তু আসলে কেউ কারো নয় এমন অবস্থা বিরাজ করছে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগে। সিটি নির্বাচনে অন্তত এমন এক খেলা দেখেছে সিলেট। সবাই মাঠে ছিলেন কামরানের পক্ষেই, কিন্তু ভোটের দিন সব হিসেব পাল্টে যায়।

এ নিয়ে সুরমায় জল ঘোলা কম হয়নি। জেলা-মহানগরের চার নেতাকে কেন্দ্র থেকে শোকজ করা হয়। বিজয় নিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও কামরান কেন হারলেন কেন্দ্র থেকে এমন প্রশ্নের জাবাব চাওয়া হয় ওই চার নেতার কাছে। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে সিলেট-১ আসনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ। এই আসনে যে জেতে তার দলই সরকার গঠন করে আধ্যাত্মিক সেই মিথই চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাই মর্যাদার এ আসনটি কোনভাবেই হাতছাড়া করতে নারাজ দলটি। দলের শীর্ষ নেতারা অবশ্য বলছেন প্রার্থী নিয়ে ধাঁধার সমাধান আসবে শিগগিরই। ড. এ কে মোমেন বলছেন আমাকে আর আমার ভাইকে ঘিরে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তার সমাধান দু-একদিনের মধ্যেই হচ্ছে। তিনি না অর্থমন্ত্রী কে প্রার্থী হচ্ছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মুখ খুলতে অনীহা প্রকাশ করলেও ড. মোমেন বলেন-এটি কোন সমস্যা না। সময়মতো সবই পরিষ্কার হবে।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নিজের প্রার্থিতার বিষয়ে অনেকটা খোলামেলাভাবেই বলে দিয়েছেন, সিলেট-১ থেকে তিনিই বিএনপির প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। দল এবং শরীকরাও তাঁর প্রার্থিতার বিষয়ে অনেকটা নমনীয় রয়েছেন বলে ইঙ্গিত দেন সাবেক এই আমলা। দৈনিক জাগরণকে তিনি বলেন, দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মতিতেই আমি সিলেট-১ আসনের জন্য মনোনয়ন নিয়েছি। যদিও ঐক্যফ্রন্ট এখনো এ আসনে কে প্রার্থী হবে তা ঘোষণা দেয়নি। তবে দলের শীর্ষ নেতারা আমাকেই এ আসনে চাচ্ছেন। দু-একদিনের মধ্যে তার নামকে ঘিরেই ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা আসবে এমন আশাও ব্যক্ত করেন ইনাম আহমেদ চৌধুরী।

আমিনুল ইসলাম রোকন

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.