রবিবার , 18 নভেম্বর 2018
ব্রেকিং

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক বিরোধী প্রচারণা এখন তুঙ্গে

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে:

2
স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক বিরোধী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ নতুন শ্রমিক নেয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সে দেশে বাংলাদেশি  শ্রমিক বিরোধী প্রচারণা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভালো-মন্দ সব মিলিয়ে সেদেশের সাধারন মানুষ থেকে শরু করে সে দেশের মিডিয়া বাংলাদেশিদের বিরুদ্বে অপ প্রচারে মাঠে নেমেছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এর পিছনে ইন্দন দিচ্ছে ভারতীয় বংশদ্ভুত মালয়রা। তাদের ইন্দনে সূর মিলিয়েছে ভ’মিপুত্রা মালয়েশিয়ানরা। পাশাপাশি সেদেশের ইমিগ্রেশন বিভাগও বসে নেই ১৫ লাখ  কর্মি নিয়োগের চুক্তি সই হওয়ার দুই দিন পর থেকে শুরু হয়েছে ধর পাকড়। গত কয়েকদিনে অভিভাসন বিভাগ বিভিন্ন জায়গায় রেইড দিয়ে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক গ্রেফতার করেছে। শুধু তাই নয় ধর্ষনের অপবাদ দিয়ে রক্তাক্ত করেছে এক বাংলাদেশি শ্রমিককে। রাস্তা-ঘাটে চলাফেরায় এবং রেষ্টুরেন্টে গেলেই বাংলাশিয়া-বাংলাশিয়া বলে মালয়েশিয়ানরা টিটকারি করে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা টেলিফোনে নবকন্ঠকে জানান, গভীর অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি আমরা। প্রতিদিন নতুন নতুন খবর বিচলিত করছে। সত্যি খবর যে কোনটা আর কোনটা আমরা বিশ্বাস করবো বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এ দেশের সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়া। নইলে এই রকম প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। এ অবস্তায় সে দেশে অবস্তানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা পড়েছেন মহা বিপদে। আতংকে দিনাতিপাত করছেন তারা।  মালয়েশিয়া বাংলাদেশ বিজনেস এসোসিয়েশনের সভাপতি রাশেদ বাদল নবকন্ঠকে জানান, মালয়েশিয়ায় প্রায় সাড়ে আট লাখ প্রবাসী বাস করছেন। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন দেশে। দু দেশের  পারস্পরিক ইস্যু নিয়ে সেদেশের সাধারন জনগন বাংলাদেশিদের বিরুদ্বে অপ প্রচার করছে। এটা মেনে নেয়া জায়না। আমাদের দেশের ১৫ লাখ কর্মি নিয়োগ শুধু ইস্যু নয়  যখন সাধারন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে তা ফলাউ করে স্যুশাল মিডিয়া ও সেদেশের পত্রপত্রিকায় পকাশ করা হয় । আর যখন তদন্ত করে প্রমাণিত হয় নির্দোষ তখন এ খবরটি আর প্রকাশ হয়না। দু দেশের সরকারের উচিত পারস্পরিক সু-সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে হবে যাতে প্রবাসীদের কোন অসুবিধা না হয়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও মালয়েশিয়ার পক্ষে দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী রিচার্ড রায়ট চুক্তিতে সই করার পরের দিনই সে দেশের মালয়েশিয়ান ইনসাইডার নামের একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে জানানো হয়েছে, মালয়েশিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এমটিইউসি) বাংলাদেশ থেকে নতুন ১৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার ঘোষণার বিষয়ে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জককে একটি রাষ্টীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে এমটিইউসি জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার জনগণের জন্য কি করা উচিত সে বিষয়ে সরকারের ভাবা উচিত।
তারা জানিয়েছে, তিন বছর মেয়াদকালের জন্য ১৫ লাখ শ্রমিক সেদেশে আনার ব্যাপারে দুই দেশের সরকারের ওই পারস্পারিক সমঝোতা স্বারকটি অগ্রহণযোগ্য।
তারা আরো বলেছে, ‘বাংলাদেশি শ্রমিকরা ইতিপূর্বে খামারের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পেত। কিন্তু এখন তারা চাকুরি, চাষাবাদ, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে নিয়োগ পাচ্ছেন’
তাদের প্রশ্ন ‘এই মুহূর্তে মালয়েশিয়ার স্থানীয় আধা দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে করণীয় কি হবে?’
এ খবর এমন সময় এলো যখন বেসরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় বড়পরিসরে কর্মী পাঠাতে ‘জিটুজি প্লাস’ সমঝোতায় সই করেছে বাংলাদেশ। এ চুক্তি অনুযায়ী দেশটিতে কনস্ট্রাকশন, সার্ভিস, প্লান্টেশন, এগ্রিকালচার এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ১৫ লাখ কর্মী যাবে।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে ১৫ লাখ শ্রমিক নেয়া নিয়ে মালয়েশিয়ায় যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে উপপ্রধানমন্ত্রী ড. আহমেদ জাহিদ হামিদির সঙ্গে আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়ায় ৬ দিনের সফর শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেছেন।
এর আগে বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার খবরে মালয়েশিয়ায় এক রকম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া বাংলাদেশি বিরোধী সেন্টিমেন্ট ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা বর্ণবাদ, অপরাধের আতঙ্ক এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
২০ ফেব্রুয়ারি পুর্তুবুহান রাপাত মালয়েশিয়া নামে একটি গ্রুপ বাংলাদেশি শ্রমিক নেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। তারা অভিবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে। তারা বলেছে, এসব শ্রমিক ধর্ষণে জড়িত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অভিবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে তারা।
তবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, আমরা যা করছি তা আমাদের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য। বৃক্ষায়ন শিল্পের মতো বিভিন্ন খাতে সস্তায় শ্রমিক প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে। এ খবর দিয়ে মালয়েশিয়ার পত্রিকা নিউ স্ট্রেইটস টাইমস ।
১৫ লাখ শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে নেয়ার চুক্তি সম্পাদনের পরপরই বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার মিডিয়ায় এক ধরনের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। ‘পাহাড়ে পালাও, বাংলাদেশিরা আসছে’ শিরোনামে ১৮ ফেব্রুয়ারি মালয় মেইল অনলাইনে এক নিবন্ধে বলা হয়, এসব শ্রমিকের কাছে আদর্শ হয়ে গেছে স্থানীয় নারীদের ধর্ষণ করা। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন জনের স্ত্রী, কন্যাদের ধর্ষণ করে তারা। তারা এমন আচরণ করে যেন তাদের ধর্ষণের লাইসেন্স আছে। এক্ষেত্রে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে? এমন প্রশ্ন রেখে তারা আরো লিখেছে, এ পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়বে।
পুর্তুবুহান রাপাত মালয়েশিয়া গ্রুপের সভাপতি বলেছেন, বিদেশি শ্রমিকরা শুধুই তাদের দেশে রোগ বহন করে নিয়ে যান। তারা সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার ঝুঁকিও আছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এমন প্রচারণা শুধু পুর্তুবুহান রাপাত মালয়েশিয়া একাই চালাচ্ছে তা নয়। অভিবাসী বিরোধী প্রবণতা মালয়েশিয়ার সমাজে এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার আরোও একটি অনলাইন লিখেছে, বাংলাদেশি শ্রমিকরা দীর্ঘদিন মিথ্যা অভিযোগের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। মালয়েশিয়ায় বেকারত্ব থেকে শুরু করে যে কোনো অপরাধের জন্য তাদের দায়ী করা হয়। এতে উস্কানি দিচ্ছে কিছু মিডিয়া।
আরেকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে একজন টিনেজ মেয়েকে বাংলাদেশি এক শ্রমিক ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনা তুলে ধরে তারা বলেছে, নতুন করে ১৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক যখন মালয়েশিয়ায় যাবেন তখন এ ধরনের আরো যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটার যৌক্তিক কারণ আছে।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি ক্ষোভ প্রকাশ করে নবকন্ঠকে বলেন,  ১২ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছি। ওরা শোষণ করে আদায় করতে জানে। এমন আচরণ  তাদের নতুন নয় অতীতেও এ ধরণের আচরন  এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
কিশোর গনজের  আনিছুর রহমান সোহেল নবকন্ঠকে  বলেন, মালয় ইন্ডিয়ানরা বাংলাদেশিদের বিরোধিতা করে আসছে সব সময়। তারা চায়না বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ায় এসে কাজ করুক। বাংলাদেশিরা আসলে তাদের কর্তৃত্ব হারাবে বিধায় বাংলাদেশের বিরোধিতা করে।
এদিকে মালয়েশিয়ার একটি এনজিও তেনাগানিতা প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ যেন মালয়েশিয়ার সরকারের প্রতি চাপ দেয়।
তেনাগানিতা অভিযোগ করে বলে, একটি চক্র প্রবাসী শ্রমিকদের জিম্মি করে মালয়েশিয়ায় অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের শিকার হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা।
প্রবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ থেকে রক্ষার জন্য বির্স্তৃত নীতিমালা গ্রহণে তাই দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় সংস্থাটি।
মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমিক মোহাম্মদ বাবুলের উদাহরণ দেয় সংস্থাটি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হন বাবুল। এ সময় তার শরীরের ৪০ শতাংশ পুড়ে যায়। কিন্তু তার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায় নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠান।
এভাবেই মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাদের এজেন্ট ও নিয়োগকর্তাদের হাতে মারাত্মকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করে এনজিওটি।
এ পরিস্থিতি উত্তরণে তেনাগানিতা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে দুই দেশের সরকারের বিস্তৃতি নীতিমালা গ্রহণ, সহজ অভিবাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং স্বচ্ছ ও উপযুক্ত মনিটরিং কার্যক্রম গ্রহণ, অসাধু এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, প্র্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে গমন নিরুৎসাহিতকরণ, কাজ শেষে প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।
এছাড়া মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও তৎপর হওয়ার জন্য মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি হাইকমিশনের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে এনজিওটি।
এসব বিষয়ে শক্ত অবস্থানে থেকে সিদ্ধান্তে পৌছাতে না পারলে সন্মান হারাবে বাংলাদেশ। যার ফল পোহাতে হবে বর্তমানে সেখানে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের।
বিষয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্তিত বাংলাদেশ হাই কমিশনে নিয়োজিত ফার্ষ্ট সেক্রেটারি এসকে শাহীন নবকন্ঠকে বলেন, শ্রমিক বিরোধি যে অপপ্রচার হচ্ছে সেটা তাদের অভ্যন্তরীন ব্যপার। তবে মানবিক কারণে যাতে করে আমাদের দেশের শ্রমিকদের অপ প্রচার না করে এ বিষয় নিয়ে সে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করা হবে।    কর্মরত শ্রমিকদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, অপ প্রচারে কান না দিয়ে দেশের ভাব মূর্ওি সমুন্নত রেখে কাজ করতে হবে এবং সেদেশের আইন মেনে চলতে হবে। কোন পরামর্শের প্রয়োজন হলে মিশনে যোগাযোগ করতে অনুরুধ জানিয়েছেন । অবৈধদের বৈধ করনের ব্যাপারে ফার্ষ্ট সেক্রেটারি এসকে শাহীন বলেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্রাইটেরিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সরকার কাজ করছে। রি-হেয়ারিংয়ের আওতায় কারা আসবে কারা আসবেনা আমাদের কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের নিয়ে সমন্বয় করে লিফলেট আকারে প্রচারের ব্যবস্তা করা হচ্ছে। এতে হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই ।

print

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.