Saturday , 16 October 2021
Breaking

তুলুজের অপ্রীতিকর ঘটনা এবং প্যারিসের নাগরিক ভাবনা

toulouse victims

নবকণ্ঠ ডেস্কঃ অতি সম্প্রতি ফ্রান্সের তুলুজের বাংলাদেশী সমাজে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আমাদের এ সমাজকে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের পরই তুলুজে সবচেয়ে বেশী বাংলাদেশী কুড়ি বছরের ও বেশী সময় ধরে বসতি গেড়েছে। এ শহরটিতে এখন হাজার দুইএর অধিক বাংলাদেশী বাস করে। জাতিগত আবেগ ঝেড়ে ফেলে এখানের বাংলাদেশীরা এক হয়ে পরষ্পর পরষ্পরের বিপদে আপদে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রবাসের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করছে।

তুলুজে রয়েছে বাংলাদেশী কমিউনিটি। সেখানের প্রতিনিধিরা সকলেই নির্বাচিত হয়েছেন বা হচ্ছেন। প্যারিসে যেটা এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। একটা নির্বাচিত সমাজ সংঘ থাকায় তুলুজের প্রতিটি বাংলাদেশী ভাই বোনেরা আপাত দৃষ্টিতে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করছেন। এখানে বাংলাদেশী সমাজ ব্যবস্থার মূল আদর্শ অর্থাৎ মুরুব্বীদের মেনে চলা, ছোট বড় সবার অবস্থান অনুসারে সম্মান ও স্নেহ প্রদর্শন, বিভিন্ন উৎসব বা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে দল মত নির্বিশেষে যোগ দেয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তুলুজের বাংলাদেশী সমাজকে প্রবাস জীবনের একটি রোল মডেল হিসেবে ধরা হয়।
অথচ কিছু অবিমৃশ্যকারী ব্যক্তির হটকারী আচরণের কারনে এ রোল মডেলের গায়ে আচড় লেগেছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, লিটন নামের এক তরুন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এ তুলুজেরই কিছু বাংলাদেশী তরুণের হাতে। নির্যাতনের শিকার তরুণ কিছুদিন হাসপাতালে কাটানোর পর এখন আশংকামুক্ত বলে জানা গেছে। তুলুজের মতো একটি জায়গায় যেখানে বাংলাদেশী সমাজিক অনুশাসন ও প্রথা মানা হয় সেখানে এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়।

লিটন নামের এ তরুণ কেন নির্যাতনের শিকার হলেন এটাও এখন সবার জিজ্ঞাসা। কি এমন অপরাধ করেছিলেন তিনি। এসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে অনেকটা কেচো খুড়তে গিয়ে সাপ বের হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, লিটন নামের এ তরুন মোটের উপর পাঁচ বা একটু বেশী বছর ধরে তুলুজে বাস করছেন। রাজনৈতিক আশ্রয় বঞ্চিত এ তরুণ তুলুজের বাংলাদেশী ভাইদের সহায়তায় কাজ ও করতেন। এ সময় তার সঙ্গে জনৈক তরুনীর পরিচয় হয়।( সঙ্গত কারনেই তরুনীর নাম ও পরিচয় গোপন রাখা হলো)। পরিচয় এক সময় পরিনয়ে রুপ পায়। এরপর লিটন বিভিন্ন সময় সে তরুনীর সঙ্গে মেলা মেশা করেছেন বলে জানা যায়। কোন এক অসতর্ক মুহুর্তে নিজেদের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি তুলে রাখে লিটন। (কারো ছাফাই গাওয়ার জন্য নয়, তবে সত্য বলতে, কোন তরুনীই চাইবেন না নিজের দুর্বল মুহুর্তের ছবি তুলতে। এ কারনেই এখানে অসতর্ক শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে)।
পরবর্তীতে এ ছবিগুলিই কাল হলো মেয়েটির জীবনে। মেয়েটির দুর্বলতার সুযোগে লিটন তাকে বিয়ে করতে চায়। এখানে জানিয়ে রাখা দরকার মেয়েটি বিবাহিতা। লিটন এসব জানার পরও মেয়েটার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।
উদ্দেশ্য, ফ্রান্সে জন্ম নেয়া এ মেয়েকে বিয়ে করে বৈধ হওয়া। যে কোন দিক দিয়ে বিচার করলেই এটা চরম অনৈতিক একটি বিষয়। এদিকে এই তরুনীর স্বামী বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে আসে। ঠিক তখনই লিটন নামের এ প্রেমিক প্রবরটি আর নিজেকে সংযত রাখতে পারেন নি। তিনি মেয়েটি সহ তার পরিবারকে অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি প্রকাশ করে দেবার হুমকি দেয়া শুরু করেন। এমনকি মেয়েটি যদি তাকে বিয়ে না করে তাহলে এসব ছবি ইন্টরনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেন তিনি। শোনা যায় এ সময় মেয়েটির পরিবারের কাছে মোটা অংকের টাকা ও দাবী করেন। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে এর চুড়ান্ত পরিণতি আসে।
লিটনকে কতিপয় যুবক মারধর করে। তারপর তুলুজের গৌরবের মুকুটে কলঙ্ক তিলক জড়িয়ে পড়ে। পক্ষে বিপক্ষে নানা কথার ফুলঝুরি ছোটে। সচেতন তুলুজবাসী এ ঘটনার বিচার দাবী করে দায়ীদের বিচারের সম্মুখীন করতে চান।
বিষয়টি সবার মনকে নাড়া দিয়েছে সন্দেহ নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কোন সভ্য মানুষের কাজ না। আবার কারো দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার পরিচায়ক হতে পারে না। আজ লিটনের প্রতি আমরা যেমন সমবেদনা জানাই ঠিক তেমনি মেয়েটার ছবি নিয়ে লিটনের কার্যকলাপকেও কোনভাবেই সমর্থন করিনা।

লিটনের উদ্দেশ্যে আজকের কমিউনিটির অনেক কথা বলার আছে; সারমর্ম হল, বড়র প্রেম কাছে টানেনা অনেক সময় দূরে ও ঠেলে দেয়। তাই অতীতের কথা ভুলে গিয়ে সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনকে স্বাগত জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ। পাশাপাশি যারা আজ কৌশলে সব কিছুর সমাধান করতে চেয়েছেন তারাও সে রাস্তা পরিহার করে লিটনের চিকিৎসা সহ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারটিকে মানবিক ভাবে সমর্থন করবেন বলে আশা করছে কমিউনিটি। দুটি অবুঝ হৃদয়ের অন্তরঙ্গতা তৈরীর প্রক্রিয়া ও পর্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে কিছু অসাবধানতা। আর এ অসাবধানতার ফলাফল তুলুজের বাংলাদেশীদের সমাজকে করেছে কলুষিত। জীবনকে ভেঙে দেয়ার মত এ ধরনের অসাবধানতা যাদের মাঝে জেঁকে বসেছিল, তারাও নিজেদের শুধরে নিয়ে সাম্যের গান গাইবেন বলেই আমাদের প্যারিসের নাগরিক সমাজ মনে করে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.